নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের বাজারে চাল, ডাল ও তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঊর্ধ্বগতির মাঝে এবার পাগলা ঘোড়ার মতো ছুটছে সুগন্ধি বা পোলাও চালের দাম। মাত্র দুই মাস আগেও যে পোলাও চালের কেজি বিক্রি হতো ১৪০ থেকে ১৫০ টাকার মধ্যে, বর্তমানে তা লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে খুচরা বাজারে পৌঁছ ২০০ থেকে ২৩০ টাকায়। হঠাৎ করে চালের এমন অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের মাথায় হাত পড়েছে। প্রশ্ন উঠেছে—দেশের এই বেহাল পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ কীভাবে টিকে থাকবে?

এক মাসের ব্যবধানে কেজিতে বাড়ল ৬০ থেকে ৮০ টাকা

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন খুচরা ও পাইকারি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, পোলাও চালের বাজারের এই চিত্র রীতিমতো উদ্বেগজনক। ব্র্যান্ডভেদে প্যাকেটজাত চিনিগুঁড়া বা কালিজিরা চাল বিক্রি হচ্ছে সর্বনিম্ন ২১০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২৩০ টাকা পর্যন্ত। অন্যদিকে খোলা পোলাও চালের দামও ১৮০ থেকে ২০০ টাকার নিচে পাওয়া যাচ্ছে না।

পাইকারি ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মাত্র এক মাস আগেও ভালো মানের এক বস্তা (৫০ কেজি) চিনিগুঁড়া চাল যে দামে বিক্রি হতো, বর্তমানে তার চেয়ে প্রায় ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত বেশি দাম গুণতে হচ্ছে। পাইকারিতেই প্রতি কেজি চালের দাম ৬০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে খুচরা ক্রেতার ওপর।

উদ্বৃত্ত থাকার পরও কেন এই সংকট?

কৃষি তথ্য ও বাজার বিশ্লেষকদের মতে, দেশে প্রতিবছর প্রায় ১০ লাখ টন সুগন্ধি চাল উৎপাদিত হয়, যেখানে অভ্যন্তরীণ বার্ষিক চাহিদা মাত্র ৪ লাখ টনের কাছাকাছি। হিসাব অনুযায়ী দেশে প্রায় ৬ লাখ টন চাল উদ্বৃত্ত থাকার কথা। তা সত্ত্বেও বাজারে হঠাৎ এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে বহুমুখী কারণ দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

১. রপ্তানি বৃদ্ধি ও সিন্ডিকেট: ব্যবসায়ীদের একটি অংশ দাবি করছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে সুগন্ধি চালের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং সরকারের পক্ষ থেকে রপ্তানির অনুমতি দেওয়ায় বাজারে এর প্রভাব পড়েছে। তবে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) এবং বাজার বিশ্লেষকদের অভিযোগ, রপ্তানির দোহাই দিয়ে একটি অসাধু চক্র ও প্রভাবশালী মিল মালিকরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে ফায়দা লোটার চেষ্টা করছে। ২. মজুতদারি: পর্যাপ্ত উৎপাদন ও পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও সুনির্দিষ্ট কিছু কোল্ড স্টোরেজ বা মিলে চাল আটকে রেখে দাম বাড়ানোর অভিযোগ উঠছে।

মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস

সাধারণত পোলাও চালের ব্যবহার শুধু বিলাসিতা বা উৎসব-পার্বণে সীমাবদ্ধ নয়, তবে নিত্যদিনের জীবনযাত্রায় এর বহুমুখী ব্যবহার রয়েছে। বিশেষ করে দেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো যখন চাল, ডাল, তেল ও শাকসবজির উচ্চমূল্যের ধাক্কা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে, ঠিক তখন পোলাও চালের এই রেকর্ড দাম তাদের কষ্টের বোঝা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

বাজার করতে আসা সাধারণ ক্রেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “দেশের বাজারে প্রতিটি পণ্যের দাম এখন মানুষের নাগালের বাইরে। মাছ-মাংস কেনা তো দূরের কথা, সাধারণ সুগন্ধি চালের দাম যদি এভাবে কয়েক দিনের ব্যবধানে দ্বিগুণ হয়ে যায়, তবে সাধারণ মানুষ খাবে কী আর বাঁচবে কীভাবে?”

করণীয় ও বিশেষজ্ঞ মতামত

বাজার বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার স্থিতিশীল রাখতে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে খাদ্যপণ্য রাখতে বাজার মনিটরিং জোরদার করা অত্যন্ত জরুরি। অসাধু মজুতদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি রপ্তানি নীতির ওপরও তীক্ষ্ণ নজর রাখা দরকার, যাতে দেশের মানুষকে জিম্মি করে কেউ অতিমুনাফা অর্জন করতে না পারে।

সাধারণ মানুষের একটাই দাবি—দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে চালের বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা হোক। অন্যথায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা আরও বেশি দুর্বিষহ হয়ে উঠবে।

Leave a Reply